ভূটান ভ্রমণ কাহিনী- সৌন্দর্য্যের এক অপরূপ জায়গা

ভুটান ভ্রমণে যাচ্ছি সড়কপথে, যাত্রী কেবল আমি আর সজীব। তো প্ল্যান ছিল সড়কপথে যাওয়ার। এজন্য লাগে ভারতের ট্রাঞ্জিট ভিসা। আর ভূটানের ভিসা বর্ডারে পৌছেই নেয়া যায় সাথে সাথে। তো সেটা নিয়ে চিন্তা ছিলনা। চিন্তা ছিল ভারতের ট্রাঞ্জিট ভিসা নিয়ে। কারণ এই ভিসা আগে কখনও করানোর দরকার হয়নি। ট্রাভেল এজেন্সীতে ভিসার জন্য কথা বললাম। তারা জানাল যে যাত্রার ৭দিন আগে ভিসার জন্য আবেদন করতে হয় আর যাত্রার দিন সকালে ভিসা পাওয়া যায়। শুনেই তো টেনশন শুরু এটা নিয়ে যে যদি সময়মত ভিসা না পাওয়া তাহলে কি হবে। তার ওপর ঐ সময়ে রাজশাহীর আইভিএসিতে বেশ জট লেগেছিল আবেদনের। যে ভিসা আগে ৭দিনে পাওয়া যেত সেটা ১৫/১৬দিনেও পাওয়া যাচ্ছিল না। তো যাই হোক, আমাদের যাওয়ার প্ল্যান ছিল ২৯এপ্রিল। ২২এপ্রিল যেয়ে ভিসার জন্য আবেদন করে এলাম দুইজনে। এরপর দ্রুত ভিসা পাওয়ার জন্য কিছু কাহিনীও করলাম, তাতে বিশেষ লাভ হল না। পাসপোর্ট হাতে পেলাম মে মাসের ৪তারিখ এবং দুইজনের কেউই ভিসা পেলাম না জানার চেষ্টা করলাম যে ভিসা কেন হয়নি। পরে বুঝতে পারলাম যে খুবই সূক্ষ্ণ কিন্তু তুচ্ছ একটা ভুলের জন্য ভিসা দেয়া হয়নি। কিন্তু যেতে তো হবেই। এদিকে রোজা শুরু হয়ে যাচ্ছে। তো ঠিক করা হল যে এখন যাওয়া হবেনা। যাওয়া হবে তিনমাস পর, মানে কুরবানীর ঈদের পর। আর যাব এবার বিমানে, যাতে করে এই ফালতু ভিসার ঝামেলায় না পড়তে হয়। এবং আরও দুইজন সঙ্গীও পাওয়া যাবে সেসময়ে গেলে। ভাল কথা। তো এবার বিমানভাড়া জমাতে লাগলাম যেটা প্রায় ২৫০০০টাকা।

দুইমাস কেটে গেল দেখতে দেখতে। এল জুলাই মাস। ঠিক হল আগস্টের ১৬তারিখ যাওয়া হবে। বিমানের টিকিটের জন্য তোড়জোড় শুরু করলাম। সরাসরি এয়ারলাইন্সে কথা বলে টিকিট ম্যানেজ করলাম ৪জনের জন্য এবং কিছু ডিস্কাউন্টও পেলাম ছাত্র হওয়ার সুবাদে(২৫০০টাকা করে টিকিটপ্রতি)। এখন শুধু টাকা পাঠালেই টিকিট কনফার্ম হয়ে হাতে চলে আসবে। তো টাকা পাঠানোর দুইদিন আগে দুইজন বলল যে যেতে পারবেনা, পারিবারিক সমস্যা। ঠিক আছে, এতদূর যেহেতু এসেছি সেহেতু পিছনে হটার কোনো মানে নেই, দুইজনেই যাব। দুজনের টিকিট ক্যান্সেল করালাম আর টিকিটের টাকা পাঠিয়ে টিকিট আনালাম বাকি দুইজনের মানে আমার আর মুনিফের। টিকিট যেদিন হাতে পেলাম সেদিন জুলাইয়ের ১৭তারিখ। যাত্রার বাকি আর ঠিক একমাস। এবার ভূটান যেয়ে থাকার জন্য হোটেল আর ঘুরে বেড়ানোর জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। শুরু থেকেই একটা এজেন্সীর সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। তাদের সাথে কথা ছিল যে ৪জন যাব। কিন্তু যখন ২জন হয়ে গেলাম তখন তারা যে টাকা চাইল সেটা দুজনের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিলনা। তাই ঠিক করলাম নিজেই সব ম্যানেজ করব।এসময়ে ToB এল ত্রাতা হয়ে। অনেকগুলো হোটেলের ঠিকানা পেলাম। হোয়াটসএ্যাপে হোটেলগুলোর সাথে সরাসরি কথা বলে ৫রাতের জন্য হোটেল আর গাড়ি ঠিক করে ফেললাম কোনোরকম এডভান্স ছাড়াই। হোটেল বুকিংয়ের রশিদও আনিয়ে নিলাম কারণ ইমিগ্রেশনে দেখতে চায় অনেক সময়। ব্যস, সব ঝামেলা শেষ। এখন টাকাপয়সা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর ব্যাগ গোছানো বাকি। হাতে সময় আছে ২০দিনের মত।

ধীরে ধীরে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ১৫আগস্ট সকাল ৭টায় দুইবন্ধু বনলতায় চেপে বসলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। মেঘলা আবহাওয়া ছিল, বৃষ্টিও হচ্ছিল মাঝেমধ্যে, মানে ট্রেনযাত্রার জন্য একদম পারফেক্ট একটা আবহাওয়া। ঢাকা পৌছালাম বেলা বারোটায়। ট্রেন থেকে নেমেই গেলাম জিগাতলায় ইয়াসীরের বাড়িতে আগের রাতে জোর করে নেওয়া দাওয়াত খেতে চরম সমাদরের মধ্যে উদরপূর্তি করে ওর বাড়িতে বসেই পরের দিনের ফ্লাইটের জন্য ওয়েব চেকইন সেরে নিলাম এবং পছন্দসই সিটও পেয়ে গেলাম। এবার শুধু রাতটা পার হবার অপেক্ষা।

রাত পেরিয়ে সকাল হল। ফ্লাইট বিকাল ৩:৫৫তে। কিন্তু আমরা ১১টা ৩০মিনিটেই বেরিয়ে পড়লাম ধানমন্ডি থেকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। ঈদের পর ফাঁকা ঢাকা। ১২টার সময় পৌছে গেলাম এয়ারপোর্টে। শাহজালাল আন্তর্জাতিকে আমার প্রথমবার। এর আগে বাইরে থেকেই দেখেছি। আজ প্রথম ভেতরে ঢুকলাম। তেমন বেশি ভীড় নেই এয়ারপোর্টে। ২নাম্বার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই আগে যোগাযোগ করলাম ড্রুক এয়ারলাইন্সের এক স্টাফের সাথে যার মাধ্যমে টিকিট করিয়েছিলাম। তাকে কিছু কাগজপত্র দেওয়ার ছিল যেগুলার সফট কপি দিয়েই তিনি টিকিট করে দিয়েছিলেন। উনি এসে কাগজগুলো নিয়ে চেক-ইন কোন রো তে হবে সেটা দেখিয়ে দিয়ে গেলেন। ওয়েব চেকইন করলেও এয়ারপোর্টের চেকইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস নিতে হয় ওয়েব চেকইনের কপি দেখিয়ে। আর বড় লাগেজ থাকলে সেটাও এখান থেকেই ইস্যু করাতে হয়। তো লাইনে দাঁড়ালাম চেকইনের। আধঘন্টার মধ্যে কাজ হয়ে গেল। এবার ইমিগ্রেশনের পালা। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। এখানে এসে প্রশ্ন জাগল যে ইমিগ্রেশন পুলিশের যেসব ইন্সপেক্টর ইমিগ্রেশনের কাউন্টারে বসেন তারা নিজেদেরকে সৌদি আরবের বাদশাহ গোছের কিছু ভাবেন কিনা। উনারা সবাই ইশারায় কাজ করতে ভালবাসেন। মুখে মনে হয় সুপার গ্লু আঠা লাগানো। আমি এর আগে এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন ফেইস করিনি কখনও। ল্যান্ডপোর্টের ইমিগ্রেশন আর এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনের মধ্যে কিছুটা তফাৎ আছে। তো অফিসারের একটা ইশারা বুঝতে না পেরে তাকে মুখে বলতে বলায় তিনি এমন ভাব দেখালেন যেন মুখ খুললেই তার চাকরি চলে যাবে যাইহোক, বিতৃষ্ণা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার করলাম। তখন বাজে দুপুর ২টা। গেট এনাউন্স হবে ৩টায়। মানে সামনের একঘন্টা কোনো কাজ নেই হাতে। ওয়েটিং লাউঞ্জের ডিউটি ফ্রি শপগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সেখানে ওয়াইনশপগুলো যখনই চোখে পড়ছে তখনই বিশেষ কিছু বন্ধুর কথা মনে হচ্ছে তো তাদের জন্য ওয়াইনশপের ছবি তুললাম কিছু  তারপর তিনটায় গেট এনাউন্স হল। সিকিরিটি চেকের লাউঞ্জে গেলাম। সিকিউরিটি চেক শুরু হবে আধঘন্টা পর। লাউঞ্জের বিশাল কাঁচঘেরা জানালা দিয়ে টার্মিনাল আর রানওয়েতে বিমানের উঠানামা দেখা যাচ্ছে। আমাকে আর কে পায় তখন! ছোটবাচ্চার মত কাঁচের সামনে দাঁড়িয়ে বিমান দেখছিলাম জীবনের প্রথম বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর বাস্তবে দেখলাম, দানব একটা!! বিশাল লম্বা। প্লেন দেখতে দেখতে সিকিউরিটি চেকের সময় হয়ে গেল। আবার লাইনে দাঁড়ালাম। সিকিউরিটি শেষ করে সরাসরি বোর্ডিং ব্রিজে, তারপর প্লেনে উঠে নিজেদের সিটে বসলাম। এয়ারবাসের এ৩১৯-১০০ মডেলের প্লেন। ভেতরটা বেশ পরিপাটি। ঠিক ৩:৫৫তে টার্মিনাল ছাড়ল প্লেন। রানওয়েতে এসে টেক-অফ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর ৪:০৫তে প্লেন উড়ল পারোর উদ্দেশ্যে।

৩৬০০০ফিট উচ্চতায় ওঠার পর ৪:৩৫এ প্লেন নিচে নামতে শুরু করল। উপর থেকে কি যে সুন্দর লাগছিল নিচের পাহাড়গুলো তা বলে বোঝানো যাবেনা। ঠিক ৪:৫৫তে প্লেন ল্যান্ড করল। বৃষ্টি হচ্ছিল তখন। আমার দেখা সেরা ল্যান্ডিং! বৃষ্টির মধ্যে ল্যান্ড করা সত্ত্বেও একফোঁটা স্কিড করেনি প্লেন। বৃষ্টির জন্য প্লেন থেকে বের হওয়া যাচ্ছিল না কারণ পারো এয়ারপোর্টে ছাউনিওয়ালা ল্যাডার নেই। কিছুক্ষণ পর তিনজন গ্রাউন্ড স্টাফ সিড়িতে ছাতা নিয়ে যাত্রীদেরকে শাটলবাসে পৌছে দেওয়া শুরু করল। বাস থেকে নেমে দাঁড়ালাম ভিসার লাইনে। বেশ ইজি প্রসেস ছিল। পারো এয়ারপোর্ট বেশ ছোট কিন্তু অসম্ভব সুন্দর আর অভিজাত! ভিসা নিয়ে বাইরে বের হয়ে এসে সিম কিনলাম। গাড়ির ড্রাইভার তিলাচানের সাথে প্লেনে উঠার আগেই কথা বলে নিয়েছিলাম। এয়ারপোর্টের পার্কিংয়ে অপেক্ষা করছিলেন তিনি আমাদের জন্য। এই ট্রিপে তিনি আমাদের ড্রাইভার এবং গাইড দুটোই। তার গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে শহরে এসে এক দোকান থেকে ডলার ভাঙালাম বেশ ভাল রেটেই(৭০নুল্ট্রাম প্রতি ডলার)। তারপর এলাম জিয়া রিসোর্টে, পারোতে এই রিসোর্টেই থেকেছি। একদমই নতুন এটা। আমরা যখন গেছি তখন একটা ব্লক কমপ্লিট হয়েছে আর আরেকটা ব্লকের ২০% কাজ বাকি। তো যাইহোক, ফর্মালিটিজ সেরে চাবি নিয়ে রুমে গেলাম। তখন বাজে সাড়ে ছয়টা। রুমটা বেশ সুন্দর। রুম থেকে পাহাড় দেখা যায় আর একদম সামনে দিয়েই পারো নদী ক্রমাগত গর্জন করে বয়ে চলেছে। এরকমই তো চাইছিলাম

ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সাড়ে সাতটায় ড্রাইভার তিলাচানকে নিয়ে বের হলাম শহরের একটা চক্কর দেওয়ার জন্য। বৃষ্টি শুরু হল তখন আবার। তবে ভূটানের বৃষ্টির একটা বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে খুবই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়, এই বৃষ্টিতে শরীর তেমন ভিজে না। ভারীবর্ষন এখানে হয়না বলেই শুনেছি। তো কিছুক্ষণ ঘুরলাম শহরের মার্কেটে। বেশ ছিমছাম, গোছানো শহর। রাস্তায় সবাই আইন মেনে চলে। কোনো ট্রাফিক সিগনাল নেই এখানে। রাস্তাগুলো তেমন প্রশস্ত নয় কিন্তু জ্যামও নেই কোনো। বেশ ভাল লেগে গেল শহরটা। রাত সাড়ে আটটায় হোটেলে ফিরে খেয়ে রুমে চলে গেলাম। পরেরদিন সকালে টাইগার্স নেস্ট জয়ের মিশনে নামতে হবে যে।

১৭আগস্ট সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে ভিউ দেখেই চোখ জুড়িয়ে গেল। রেডি হয়ে চলে গেলাম হোটেলের রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে। ফ্রি নাস্তা তবে বেশ ভাল ছিল নাস্তাটা। নাস্তা সেরে তিলাচানের সাথে বেরিয়ে পড়লাম তাক্তসাঙ(টাইগার্স নেস্টের জঙখ্যা ভাষার রূপ) এর উদ্দেশ্যে। ২০মিনিটের পথ হোটেল থেকে। পৌছালাম সকাল ৮টায়। তারপর টিকিট কাটলাম। টিকিটের দাম ৫০০নুলট্রাম। কিন্তু স্টুডেন্ট আইডি কার্ড দিয়ে ৫০%ডিসকাউন্ট পেয়ে গেলাম  তবে কেউ যদি মনেস্ট্রির ভেতরে না যেতে চায়, শুধু ট্রেকিং করতে চায় তার এই টিকিট কেনার দরকার নেই। তারপর দুইজনে ১০০নুলট্রাম দিয়ে দুইটা লাঠি ভাড়া নিয়ে ১০৩০০ফিট উঁচু পাহাড় বাইতে শুরু করলাম। লাইফে প্রথম ট্রেকিং আমার। মুনিফ এর আগে ট্রেকিং করেছে সীতাকুন্ডে। পনের মিনিটের মধ্যেই টের পেলাম যে এই কম্ম অত সোজা নয়। ১০মিনিট উঠলে ১৫মিনিট রেস্ট নিতে হয় এরকম অবস্থা আমার। কিছুদূর উঠার পর আস্তে আস্তে সুন্দর সুন্দর ভিউ পেতে শুরু করলাম। রেস্ট নেয়ার জন্য যখন দাঁড়াচ্ছিলাম তখন ছবি তুলছিলাম প্রচুর। এ সময়ে আমাদের পেছনের ট্রেকাররা আমাদেরকে ক্রস করে চলে যাচ্ছিল। তো একটু পর আমরা আবার এগুনো শুরু করে দেখি তারা কিছুদূর যেয়ে রেস্ট নিচ্ছে, আমরা তখন আবার তাদের ক্রস করে চলে গেলাম এই খেলাই চলেছে সারাটা পথ  শেষে সবাই প্রায় একই সময়ে টাইগার্স নেস্টে পৌছেছি। মাঝপথে একটা ক্যাফেটেরিয়া আছে। সেখান থেকে অস্ট্রিয়ান একটা দলের সঙ্গে জুড়ে গেলাম। এরপর তাদের সাথে গল্প করতে করতে বাকি পথটুকু গেছি কোনো কষ্ট অনুভব করা ছাড়াই। টাইগার্স নেস্টে পৌছানোর পাঁচমিনিট আগে একটা ঝর্ণা আছে, ঝর্ণার পানির ঝাপ্টা খুবই ঠান্ডা। বেলা ১০:৪০ এ পৌছালাম গন্তব্যে, টাইগার্স নেস্টে। গাইড ছাড়া মনেস্ট্রির ভেতরে যাওয়া যায়না। কিন্তু মজার ব্যাপার হল সাথে গাইড না থাকলেও অসুবিধা নেই। এখানে ফ্রিতে গাইড পাওয়া যায় যে ভেতরের সবটা ঘুরিয়ে দেখায়। মনেস্ট্রির বাইরে কাউন্টারে ব্যাগ, মোবাইল সবকিছু রেখে একজন গাইডের সাথে আমরা দুইজন এবং আরও চারজন ইন্ডিয়ান, মোট ছয়জন ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। তো আমরা গাইডকে ফলো করতে থাকলাম। সে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাল এবং সব ইতিহাস জানালো। বেশ ইন্টারেস্টিং এখানকার ইতিহাস। সোয়া একঘন্টার মত সময় লাগল ভেতরটা ঘুরে দেখতে। বাইরে বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি হচ্ছে। ১০৩০০ফিট উচ্চতায় বৃষ্টির বিশেষত্ব হল চোখের সামনেই ভেসে থাকা মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়া দেখতে পাওয়া। এ সময়ের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার পর এবার ফেরার জন্য পা বাড়ালাম। সঙ্গী হিসেবে পেলাম বেঙ্গালুরু থেকে আসা দুইজন ডাক্তার। তাদের সাথে কথা বলতে বলতে নিচে নেমে এলাম। তখন দুপুর প্রায় দেড়টা। টাইগার্স নেস্টের নিচে হ্যান্ডিক্র্যাফটস এর বেশ কিছু দোকান আছে। বাংলাদেশে থাকতে কেউ একজন বলেছিল হ্যান্ডিক্র্যাফটস এর জিনিস নাকি এখানেই সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যায়। সেখান থেকে কিছু কেনাকাটা করলাম। বেশ দরদাম করেই কিনেছিলাম সব। তবে পরে থিম্পু যেয়ে টের পেয়েছিলাম যে ওখানে দরদাম করে কিনেও ঠকেছি কারণ একই জিনিস থিম্পুতে আরও কম দামে বিক্রি হচ্ছিল। তাই হ্যান্ডিক্র্যাফটসের জিনিস থিম্পু থেকে কেনাই উত্তম বলে মনে হয়েছে। তো যা বলছিলাম, কেনাকাটা সেরে ক্লান্ত শরীরে হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম দুপুরের খাবার। তারপর রেস্ট নিয়ে বিকেলে বের হলাম। বের হয়ে রিনপুং জং, রিভারসাইড এই জায়গাগুলো দেখলাম। রিনপুং জং থেকে গোটা পারো শহরের বেশ ভাল ভিউ পাওয়া যায়। সেখান থেকে গেলাম রিভারসাইডে। এই জায়গাটাও বেশ সুন্দর। পারো নদীর বয়ে চলা দেখা বেশ সুন্দরভাবে। সেখান থেকে বের হয়ে গেলাম মার্কেটে। মার্কেট থেকে একটা ব্যাকপ্যাক কিনলাম। তারপর একটা স্ট্যাম্পশপে গিয়ে কিছু স্যুভেনির কিনলাম। পারোতে এই স্ট্যাম্পশপটাই ভাল লেগেছে গিফট কেনার জন্য। রাত ৮টায় হোটেলে ফিরে এলাম।

১৮আগস্ট সকালে উঠে ৮টার মধ্যে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম চেলে লা পাস যাওয়ার উদ্দেশ্যে। চেলে লা যাওয়ার রাস্তাটা বেশ এডভেঞ্চারাস। অসংখ্য বাঁক আর বেশিরভাগ বাঁকগুলোই ১৭০° এর মত! ক্যামেরার ভিডিও অন করে রেখে তিলাচানের সাথে গল্প করতে করতে এগিয়ে চললাম চেলে লার দিকে। তিলাচান নেপালী বংশোদ্ভূত। তার ইংরেজিটা কাঁচা, হিন্দিটা চলনসই। তো তার সাথে আমার চলনসই এর চেয়ে একটু ভাল হিন্দিতেই কথা চালিয়ে গেলাম। লোকটা কথা বলতে পারে বেশ। মোটামুটি দেড়ঘন্টায় পৌছে গেলাম ১৩০০০ফিট উচ্চতায় চেলে লা পাসে। নেমেই আশেপাশে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। এত সুন্দর!! দূরের পাহাড়গুলোর নীলাভ আভা বেশ সুন্দর লাগছিল দেখতে। ২০মিনিট পাহাড় বেয়ে উপরে উঠলাম। এখান থেকে চারপাশের বেশ সুন্দর ভিউ পাওয়া যাচ্ছিল। ইচ্ছা ছিল এখান থেকে ভূটানের সর্বোচ্চ চূড়া জমলহারী পর্বত দেখার, কিন্তু মেঘের জন্য দেখতে পেলাম না তারপর দেড়ঘন্টা ধরে অনেক ছবি তুলে চা আর থুকপা(ক্ষীরজাতীয় খাবার) খেয়ে রওনা হলাম পারোর উদ্দেশ্যে। এর পরের প্ল্যান হল পারোতে পৌছে দুপুরের খাবার খেয়ে দেড়টার মধ্যে থিম্পুর উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া। কিন্তু দ্য গ্রেট গুজ্জুবয় নরেন্দ্র মোদীর জন্য প্রায় দেড়ঘন্টা এয়ারপোর্টের পাশে অপেক্ষা করে থাকতে হল। কারণ তিনি তার ভূটান ভ্রমন সাঙ্গ করে তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে থিম্পু থেকে পারো আসছেন নয়া দিল্লী যাওয়ার জন্য, তাই পারো থেকে থিম্পু যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। গুজ্জুবয় এলেন, এয়ারপোর্টে নামলেন, ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমানে করে নয়া দিল্লীর উদ্দেশ্যে উড়লেন দুপুর আড়াইটায়। আমরা এয়ারপোর্টের উপরের রাস্তায় বসে সব দেখলাম। তারপর বিকাল তিনটায় রাস্তা খুলল। শুরু হল থিম্পুর উদ্দেশ্যে যাত্রা। পারো-থিম্পু হাইওয়ের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একপাশে পাহাড় আরেকপাশে নদী, লিটারেলি বাচ্চার মত গাড়ির জানালার সাথে লেপ্টে থেকে পাহাড় দেখছিলাম। এই রাস্তায় অনেক বাঁক, তবে চেলে লার মত অত তীক্ষ্ণ নয়। বিকাল সাড়ে চারটায় পৌছালাম থিম্পু। এসেই আগে ক্লক টাওয়ার দর্শন সেরে নিলাম। তারপর উঠলাম ফাইভ স্টার তাশি তাজের ঠিক উল্টাদিকে হোটেল ম্যাজেস্টিক এ। এই হোটেলটা জিয়া রিসোর্টের মালিকের বোনের। এই হোটেলটাও মাত্রই তৈরী হয়েছে। আমরাই তাদের প্রথম কাস্টোমার। তাই আমাদেরকে সম্মান জানানোর জন্য তারা স্ট্যান্ডার্ড রুমের ভাড়ায় Deluxe Suit দিয়ে দিলেন একটা থাকার জন্য যেটার ভাড়া স্ট্যান্ডার্ড রুমের প্রায় ৪গুণ! আর সাথে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট তো ছিলই। আমাদের তো সোনায় সোহাগা অবস্থা তখন ৪তলায় রুম, রুমের দুইদিকে কাচের জানালা। একদিকের জানালা দিয়ে রাস্তার ঠিক অপরপাশের ফাইভ স্টার তাশি তাজ আর তার পেছনের পাহাড় দেখা যায়, আরেক দিকের জানালা দিয়ে দূরে বুদ্ধ পয়েন্টে আসীন গৌতম বুদ্ধকে দেখা যায়। তো ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সন্ধ্যার পর বের হলাম খাবারের খোঁজে। একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে রাতের খাবার সেরে নিলাম। তারপর হোটেলে এসে ঘুম।

১৯তারিখ সকালে উঠে রেডি হয়ে নাস্তা সেরে ৯টায় গেলাম ইমিগ্রেশন অফিসে। একটা কথা এখানে বলা দরকার, বর্ডারে বা এয়ারপোর্টে যখন ভিসা ইস্যু করা হয় তখন সে ভিসায় শুধুমাত্র ফুন্টশোলিং, থিম্পু এবং পারো এই তিন শহরে যাবার অনুমতি দেওয়া থাকে। এছাড়া অন্য যেকোনো শহরে যাওয়ার জন্য থিম্পুর ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পারমিশন নিতে হয়। পারমিশন নেওয়া খুব কঠিন কিছু না। একটা ফর্ম ফিলাপ করতে হয় আর সাথে পাসপোর্ট ও ভিসার ফটোকপি দিতে হয়। আমরা পুনাখা যাব, তো সকাল নয়টায় ফর্ম জমা দিলাম। বলা হল সাড়ে এগারোটায় আসতে। হোটেলে ফিরে এসে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে এগারোটায় আবার গেলাম ইমিগ্রেশন অফিসে। গিয়ে দেখি পারমিশন রেডি। সোয়া এগারোটায় রওনা দিলাম ভূটানের প্রাক্তন রাজধানী পুনাখার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে দোচু লা পাসে দাঁড়িয়ে জমলহারি পর্বতের চূড়া দেখার প্ল্যান আছে যেহেতু চেলে লা থেকে দেখতে পাইনি। ৪৫মিনিটে পৌছে গেলাম দোচু লা পাস। কিন্তু বিধিবাম। সেদিন চেলে লা তে ছিল মেঘ, আর আজকে দোচু লা তে এসে দেখি পৌষমাসের কুয়াশা!! জমলহারির দর্শন এই ট্রিপে হচ্ছেনা তা বোঝা হয়ে গেল। দোচু লা পাসে একটা মেমোরিয়াল আছে, অসমীয়াদের সাথে যুদ্ধে নিহত ১০৮জন বৌদ্ধ সৈনিকের স্মরণে তৈরী এটা। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম পুনাখার উদ্দেশ্যে। পুনাখা পৌছালাম দুপুর পৌনে দুইটার সময়। ভূটানের সবচেয়ে সুন্দর জং হচ্ছে পুনাখা জং। শুরুতেই এলাম এই জং দেখতে। মচু নদীর ঠিক সাথেই লাগোয়া এই জং। পাথুরে এই নদীর বাতাস খুবই উপভোগ্য। এখানেও টিকিটে ৫০%ডিসকাউন্ট পেলাম ছাত্র হওয়ার সুবাদে এবং এখানেও ফ্রিতে গাইড পাওয়া যায়। গাইডের সাথে সবটা ঘুরে দেখলাম। প্রতিটা জংয়ের দুইটা ভাগ থাকে, একটা হচ্ছে প্রশাসনিক যেখান শহর পরিচালনা করা হয়, এই অংশে পর্যটকদের যাওয়া নিষেধ। আরেকটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক যেখানে সাধকরা ধর্মকর্ম পালন করেন, এটা পর্যটকরা ঘুরে দেখতে পারেন। দুইঘন্টা ছিলাম জংয়ে। তারপর বেরিয়ে এসে গেলাম সাসপেনশন ব্রিজের দিকে। ভূটানের সবচেয়ে বড় সাসপেনশন ব্রিজ, জং থেকে ১০/১৫মিনিটের হাঁটাপথ। গেলাম সেখানে। লোহার ফ্রেমের ব্রিজ, স্টিলের পাত দিয়ে বানানো ফ্লোর, আর দুইপাশে লোহার দড়ি দিয়ে টানা দেওয়া। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা মচু নদী, আর ব্রিজের দুইপ্রান্তে পাহাড়ের সারি। হেঁটে ব্রিজের মাঝামাঝি আসার পর বাতাস এত তীব্র যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোই যাচ্ছিল না। হেঁটেই ব্রিজটা পার হয়ে অপরপাশে গেলাম, ৬/৭মিনিট লাগে ব্রিজটা হেঁটে পার হতে।। সেদিকে বাচ্চাদের একটা স্কুল আছে। সেখানে একটু দাঁড়িয়ে আবার ব্রিজ পার হয়ে ফিরে এলাম। বিকাল সাড়ে চারটা বেজে গেছে ততক্ষণে, সেই যে হোটেল নাস্তা করেছিলাম সকালে, তারপর আর পেটে কিছু পড়েনি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। হেঁটে গাড়ির কাছে এলাম। তারপর তিলাচান পুনাখা শহরের ভেতরে এক রেস্তোরায় নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে গোগ্রাসে গিললাম তিনজনেই পেট না ভরা পর্যন্ত। খেয়েদেয়ে বাজে সোয়া ছয়টা, সন্ধ্যা নামবে নামবে করছে। এবার থিম্পু ফেরার পালা। গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে ক্লাসিক হিন্দি গান শুনতে শুনতে রাত সাড়ে আটটায় পৌছে গেলাম থিম্পুতে। হোটেলে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে মনে হল পেটে আরেকটু কিছু দেওয়া দরকার
তো আবার দুইজনে বের হলাম। ভূটানে দোকানপাট সাড়ে আটটা থেকেই বন্ধ হতে শুরু করে। ক্লক টাওয়ারের আশেপাশে কিছু পাওয়া যেতে পারে ভেবে সেদিকে গেলাম। মোমো খেতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু বিধিবাম। মোমো পাওয়া যায় এমন রেস্তরাঁ আর দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ক্লক টাওয়ারের সামনে একটা ক্যাফে খোলা পেয়ে সেখানে গেলাম। একটা এগ ম্যাগি নিয়ে দুজনে শেয়ার করে খেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।

২০আগস্ট ঘুম ভাঙল অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু দেরীতে। কারণ আজ তেমন তাড়া নেই। থিম্পুতে সাইটসিয়িং শেষ করে সন্ধ্যার আগে পারো পৌছালেই চলবে। আজকের দিনটাও অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই রৌদ্রজ্জ্বল। তো একটু রয়েসয়ে নাস্তা সেরে সকাল নয়টায় চেক আউট করলাম হোটেল থেকে। হোটেলের মালকিন নির্মলাকে ধন্যবাদ দিয়ে এলাম তার আতিথেয়তার জন্য। হোটেল পুরোপুরি চালু না হওয়া সত্ত্বেও সে তার অতিথিদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখেনি। তো বের হয়ে প্রথমেই গেলাম জং দেখতে। ভেতরে ঢুকিনি, বাইরে থেকেই দেখেছি, কারণ সবচেয়ে সুন্দর জংটা দেখে ফেলার পর অন্যগুলো তেমন ভাল না লাগাই স্বাভাবিক। শুধু শুধু দেড়শ নুলট্রাম খরচ করার কোনো মানে নেই। জং দেখার পর গেলাম ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চর্টেন দেখতে। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। বেশ সুন্দর জায়গাটা। মন্দিরের চূড়াটা বেশ উঁচু, চূড়ায় ওঠার সিঁড়ি আছে, কিন্তু ওঠার অনুমতি নেই পর্যটকদের। এখানে ছবিটবি তুলে বেশ অনেকটা সময় কাঁটিয়ে বের হলাম। গন্তব্য এবার বুদ্ধ ডোর্ডেন্মা বা বুদ্ধ পয়েন্ট। এখানে পাহাড়ের উপরে আসীন গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। মূর্তিটার উচ্চতা ৫৪মিটার বা ১৭৭ফিট। এখানে এখনও টিকিট ছাড়াই ঢোকা যায়। তবে কিছু সংস্কার কাজ চলছে, কাজ শেষ হলে এখানেও টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। এখানে এসে পুরো থিম্পু শহরের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। ঘন্টাখানেক ছিলাম এখানে, সবটা ঘুরে দেখেছি, অনেক ছবিও তুলেছি। এখান থেকে যখন বের হলাম তখন সবে বেলা বারোটা বাজে। থিম্পুতে আর কিছু দেখার প্ল্যান নেই। তো রওনা হলাম হোটেলের এরিয়ার দিকে, উদ্দেশ্য হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারা। একটু আগে থিম্পুর যেই দোকানগুলোর কথা বলছিলাম, সেগুলোতে। এই দোকানগুলো তাশি তাজের সামনের রাস্তাটার মাঝের সড়ক বিভাজক(রোড ডিভাইডার) এর উপর। প্রায় ৩৫০মিটার লম্বা সড়ক বিভাজকের সবটা জুড়েই ছোট ছোট হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকান। পারোতে টাইগার্স নেস্টের নিচে যা পাওয়া যায়, এখানেও তার সবকিছুই পাওয়া যায়। কিন্তু ওখানকার চেয়ে এখানে দাম প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ। যেমন, ওখানে যে জিনিসটা ৫০নুল ট্রামে কিনেছিলাম সেটা এখানে ৩৫নুলট্রামে পেয়েছি। এখানে এসে আফসোস করছিলাম যে কেন পারোতে টাকাগুলো ঢাললাম যাইহোক, এখান থেকেও কিছু কেনাকাটা করলাম। তারপর গেলাম আগের রাতের অপূর্ণ ইচ্ছা পূর্ণ করতে, মোমো খেতে আর কি  ক্লক টাওয়ার থেকে সামনে এগিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে মোমো আর এগ চাওমিন অর্ডার দেওয়া হল। তারপর খেয়ে দেয়ে বেলা ১২:৪৫ এর দিকে থিম্পু ভ্রমণ সাঙ্গ করে রওনা হলাম শান্তির শহর পারোর উদ্দেশ্যে। এই সফরে সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে পারো শহরটাকে। পুনাখা শহর যতটুকু দেখেছি তাতে অতটা গোছানো মনে হয়নি, থিম্পু রাজধানী হওয়ায় কৃত্রিমতা খানিকটা আছে, তবে পারো একেবারেই প্রাকৃতিক। একদম ছবির মত। পারো শহরে ঢোকার মুখে এয়ারপোর্ট ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ালাম। এখান থেকে গোটা এয়ারপোর্টের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলে এলাম সেই আগের হোটেলে যেখানে প্রথমদিন এসে উঠেছিলাম। এসে চাবি নিয়ে চলে গেলাম রুমে। রেস্ট নিয়ে বিকেলের দিকে বের হলাম শেষবারের মতন এই সুন্দর শহরটায় একটা চক্কর দিতে। স্ট্যাম্পশপটায় আবার গেলাম। যদিও কিছু কিনিনি এবার আর। সেখান থেকে বের হয়ে গেলাম পারোর বিখ্যাত মাউন্টেন ক্যাফেতে। সেখানে ট্রাই করলাম টুনা থাই ফ্রায়েড রাইস। বেশ ভাল ছিল খেতে। সেখান থেকে বের হয়ে রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে গেলাম আরেকটা রেস্তোরাঁয় আসলে শেষদিন, আর পকেট তখনও যথেষ্টই ভারী, তো যা হয় আর কি সেখানে গিয়ে মোমো আর সুজা(ভূটানের ঐতিহ্যবাহী মাখন চা) খেতে আলাপ হল এক বাংলাদেশি ফ্যামিলির সাথে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া। তার মধ্যে স্বামী হচ্ছেন আবার ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে পাস করা। ব্যস, আর কি লাগে আলাপ জমাতে! কথায় কথায় জানা হল যে তাদের ট্যুরটা খুবই বাজে গেছে দ্য গ্রেট গুজ্জু বয়ের জন্য  কারণ তারা স্থলবন্দর দিয়ে এসেছেন আর স্থলবন্দরগুলোতে নরেন্দ্র মোদি আসার চারদিন আগে থেকেই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। ফলস্বরুপ তারা স্থলবন্দর ফুন্টশোলিংয়েই চারদিন আটকে ছিলেন। দেশের ভেতরে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছিলেন না। এরপর আমাদের কাছে শুনলেন যে আমরা কিভাবে এসেছি আর কিভাবে সব সম্পন্ন করেছি। আমাদের সবকিছু শুনে তাদের কষ্ট আরও বাড়ল কারণ তারা আমাদের মত করে চলাফেরা করেও, আমাদের মত হোটেলে থেকেও আমাদের চেয়ে মাথাপিছু অনেক বেশি গুনেছেন  তারা বারবার আমাদের প্ল্যানিংয়ের প্রশংসা করছিলেন  তো আরেকটু কথাবার্তা বলে বের হয়ে এলাম রেস্তোরাঁ থেকে। রাস্তায় নেমেই মুনিফ সেই বাংলাদেশী ফ্যামিলির দুর্দশাগ্রস্ত সফরের কথা ভেবে অটঠাসিতে ফেটে পড়ল  তারপর আরেকটু এদিক সেদিক ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম।

২১তারিখ সকাল সকাল উঠে তৈরী হয়ে নিলাম। সকাল ১০:৩০ এ ফ্লাইট, ৮:৩০ এর মধ্যে পৌছাতে হবে এয়ারপোর্টে। ওয়েব চেকইন করা ছিল অবশ্য আগেই। নাস্তা সেরে হোটেলের স্টাফদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম। তিলাচান আজ তার নতুন গাড়ি নিয়ে এসেছেন আমাদের জন্য। দেখে ভাল লাগল। তারপর সকাল ৮:৪৫ এ পৌছে গেলাম এয়ারপোর্টে। তিলাচানকে কিছু সম্মানী দিয়ে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষবারের মতন তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকে গেলাম। আজকে চেকইন, ইমিগ্রেশন সবই বেশ স্মুথ ছিল। সোয়া নয়টার মধ্যেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয়ে গেল। এরপর বসে থেকে থেকে কিছুক্ষণ পর ঢুকলাম এয়ারপোর্টের বুকশপে। খুবই সুন্দর একটা বুকশপ। সেখান থেকে কয়েকটা পোস্টকার্ড কিনলাম। সকাল ১০টায় টার্মিনালে এসে দাঁড়াল এটিআর কোম্পানীর ৪২-৫০০ মডেলের প্রপেলার ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানটি যেটি আর কিছুক্ষণ পরেই ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে। ১০:১৫তে বোর্ডিং শুরু হল। ঠিক ১০:৩০ এ প্লেন উড়ল ঢাকার উদ্দেশ্যে। আজকে আর নিচের ভিউ দেখে তেমন কিছু মনে হচ্ছিল না। একঘন্টা পর বেলা ১১:৩৫ মিনিটে বিমান ঢাকার রানওয়ে টাচ করল। তারপর প্লেন থেকে নেমে শাটল বাসে করে এসে এরাইভাল লাউঞ্জের সামনে এসে নামলাম। তারপর ভেতরে ঢুকে ইমিগ্রেশন থেকে এরাইভাল সিল নিয়ে নিলাম। এবার অবশ্য ইমিগ্রেশনে কোনো সমস্যা হয়নি। ইমিগ্রেশন পার করে এসে একটা ব্যাংকের বুথ থেকে কারেন্সী এক্সচেঞ্জ করে টাকা করে নিলাম। তারপর বাইরে এসে এক হোটেলে ঢুকে ভাত, ডালভর্তা, মুরগী আর ডাল খেয়ে এয়ারপোর্ট স্টেশনে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম বনলতা এক্সপ্রেসের। টিকিট আগে থেকেই করা ছিল। দুপুর ২টায় ট্রেন এল। তারপর সন্ধ্যা ৭টায় এসে নামলাম রাজশাহীতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: