সাধারণ মানুষের ‘বন্ধু’ হয়ে থাকতে চান ডিআইজি হাবিবুর রহমান

২০০৯ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (সদর) হিসেবে দায়ীত্ব পালনকালে আলোচনায় আসেন গোপালগঞ্জের চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামের এই যুবক। কর্মস্পৃহা ও যোগ্যতার কারণে পুলিশের আইডল হিসেবে সু-পরিচিতি পান তিনি। চারদিকে ছড়াতে থাকে হাবিবুর রহমানের জয়জয় রব।

গোপলগঞ্জের চন্দ্রদিঘলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে  লেখাপড়ার হাতেখড়ি হাবিবুর রহমানের। এস,এম মডেল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে এসএসসি, বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচএসসি পাশ করে ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে দুই বোন এবং মা মোসাম্মৎ রাবেয়া বেগম পুরোপুরি গৃহিনী । বাবা মরহুম আব্দুল আলি ছিলেন মফস্বলের ব্যবসায়ী । সততার সাথে ব্যবসা করেছেন-সন্তানদেরও শিখিয়েছেন-‘সততাই মহৎগুণ’।

বাংলাদেশ পুলিশের ‘বড়কর্তা’ হবেন-ভাবনার দেয়ালে এমন কোনো রেখাচিত্র ছিলো না তাঁর। সতীর্থদের ভাবনার অন্তমিলে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৭তম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে ‘সহকারি পুলিশ সুপার’ পদে যোগদানের আমন্ত্রণ না পেলে হয়তো শিক্ষকতাই  পেশা হতো গোপালগঞ্জের চন্দ্রদীঘিনালা’র ব্যবসায়ী আব্দুল আলি’র পুত্র অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান।

নিকষ অন্ধকারে আলোর মশাল হাতে যিনি সব সময় সমালোচনার উর্ধ্বে থেকেছেন কৃতিত্বের সাথে।  যোগ্যতা ও ব্যতিক্রমী চিন্তা- চেতনার  এই পুলিশ কর্মকর্তা  রাষ্টের সর্বোচ্য খেতাব ‘ বিপিএম’ ‘পিপিএম’ জিতে নিয়েছেন বারবার।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহন ও অবদান নিয়ে। গবেষণাধর্মী এ কাজ করতে গিয়ে তাঁর একক প্রচেষ্ঠায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিষ্ঠিত হয়  পুলিশের ‘মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর’।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করে সবার জন্য উম্মক্ত করে দিয়ে আলোচনায় আসেন  তিনি । অর্জন করেন  বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্য উপাধি প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম)  । এর আগে সফলতার পালক হিসেবে কয়েকবার কপালে এঁটেছেন বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ।

প্রায় তিনি বলেন- বাবা বলতেন, সব মানুষকে সমান ভাবে ভাবতে শিখো, দেখো-মানুষে মানুষে ব্যবধান অনেক কমে যাবে।

বাবার মতোই মানুষকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি। স্কুল থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্ম জীবন-সব খানেই বাবার দেখিয়ে দেয়া পথে হেটেছেন হাবিবুর রহমান। তিনি আরও বলেন, মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে ভাবতে না পারলে নিজেকে ‘মানুষ’ দাবি করা অবান্তর ।

হঠাৎ করে আলাদিনের চেরাগ না কি পরশ পাথরের ছোঁয়ায় বদলেছে পটভুমি-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য যে কেনো পেশার চেয়ে ‘পুলিশ’ অনেক বেশি অবহেলিত। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, পুলিশ সদস্যরা দিন-রাত খাটেন আবার খাটতে খাটতে মরেন ! তারপরও তিরস্কার ছাড়া লালগালিচায় উলুধ্বনি ভাগ্যে জুটে না পুলিশের। সময়মতো ভাগ্যে জুটেনা পেনশনও ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বার্ধক্যে অবসর কিংবা মৃত্যজনিত পেনশন পেতে পুলিশ পরিবারের ভোগান্তি লাগব করতে বিশেষ ভুমিকা রেখেছেন উর্দ্ধতন এই পুলিশ কর্মকর্তা । মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে দাবিকৃত পেনশনের টাকা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহন করে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের হৃদয়ে স্থান করে নেন তিনি। হাবিবুর রহমান বলেন, স্বজনের চোখের জল শুকানোর আগেই পেনশনের দাবিকৃত টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা একমাত্র বাংলাদেশ পুলিশই করতে পেরেছি  আমরাই ।

ব্যতিক্রম একজন পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান । সহকর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে ‘ বন্ধু ’ হিসেবে পরিচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা  বেদে সম্প্রদায়ের অবহেলিত জনপদের জীবনযাত্রা দিক পরিবর্তণ করে দ্বিতীয়বার আলোচনায় আসেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন সমএকসময় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অপরাধ জগতের আলোচিত হয়ে উঠছিলো সাভার অঞ্চরের বেদেপল্লীর মানুষ। মাদক থেকে শুরু করে ছিনতাই. অপহরণ থেকে হত্যাসহ নানান অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছিলেন তারা । বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে বেদেপল্লীর ছেলে- মেয়েদের জন্য কর্মমুখি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন তৎকালিন ঢাকা জেলার এসপি হাবিবুর রহমান ।  একই সাথে কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেন তিনি।

হাবিবুর রহমানের মহানুভবতা ও দিক নির্দেশনায় বদলে যেতে থাকে বেদেপল্লীর দৃশ্যপট। অপরাধমুলক কমকা- ছেড়ে বেদেপল্লীর সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে কর্মমুখি। মানুষের পাশে থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠেন হাবিবুর রহমান।

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর!

মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন  অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান।

নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত :

নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে পুলিশ। এর অংশ হিসেবে জুমার নামাজের পর মসজিদে মসজিদে বক্তব্য দেন ইমাম ও পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা বলেন, পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ পেতে ঘুষ লাগবে না। যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে।

অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ পুলিশের দীপ্তিমান দীপাঞ্জন

অনেক প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি হতাশা ক্ষোভ অনুনয় অভিযোগ অনুযোগ আলো আঁধারের মাঝে বাংলাদেশ পুলিশের দীপ্তিমান দীপাঞ্জন হচ্ছেন অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান। প্রায়ই গৌরবোজ্জ্বল পুলিশ বিভাগকে নানা  প্রশ্নবিদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে যার  সার্বিক  কর্মকান্ড এই বিভাগকে  সন্মাননা দিয়েছে এবং  ভাবমূর্তিকে  করেছে জাজ্বল্যমান।

নিতান্তই মনের গভীরের কিছু বোধ নিঃসৃত করলাম, সর্বাগ্রেই শুধু বহুদোষে দুষ্ট পুলিশ? এ সমাজ সভ্যতা রাষ্ট্র সব কিছুর দায়বদ্ধতা শুধুই কি পুলিশের? এই প্রশ্নের জবাব নাই!

বাংলাদেশ পুলিশের উজ্জ্বল নক্ষত্র অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান  শুধু  তার ব্যক্তিসত্তাকেই নয় বরং পুরো বাহিনীর অবয়বকে একটি গ্রহণযোগ্য অবয়বে ।

শুধু পুলিশ নয় সাধারণ মানুষের বন্ধু হয়েই বেঁচে থাকতে চান তিনি।  বলেন, জনগনের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া  পুলিশের পক্ষে সেবার দরজা প্রসারিত করা সম্ভব না। আর সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেতে হলে তাদের কাছাকাছি থাকতে হবে, পাশাপাশি থাকতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশের পোশাকে সাধারণ মানুষের বন্ধু হয়ে তাঁদের সেবা করতে চাই।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহের বিখ্যাত উক্তি- যে দেশে গুণীর কদর নেই সেই দেশে গুণী জন্মাতে পারে না ,  সময় এসেছে গুণীজনের গুণকে স্মরণ করার, সময় এসেছে পুলিশ বাহিনীর উৎকর্ষতাকে ছড়িয়ে দেবার, আলোকিত হবার এবং আলোকিত করবার, নতুন প্রজন্মের পুলিশিং হোক একই গ্রহের সামাজিক পারিবারিক এবং রাষ্ট্রিক, আসুন এই প্রত্যয় বুকে ধারণ করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: