স্পন্সর নেই যে দলটির – ক্রিকেট বিশ্বের একসময়ের পরাশক্তি জিম্বাবুয়ে

আজ থেকে বিশ বছর আগে কোকা কোলা, ক্যাসল লেজার, ভিগা স্পোর্টসওয়ার, জিমগোল্ডের মতো বিখ্যাত কোম্পানির সাথে স্পন্সরশীপ ছিল ক্রিকেট জিম্বাবুয়ের কিন্তু আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় পরে শুধুমাত্র জার্সিতে নাম, নাম্বার ও জাতীয় লগো নিয়েই খেলতে বাংলাদেশে এসেছে জিম্বাবুয়ে দলটি।

সোনালী অতীত হারিয়েছে অনেক আগেই এখন ক্রিকেট থেকেই একপ্রকার নিষিদ্ধ এক সময়ের বিশ্ব ক্রিকেটে সমীহ জাগানিয়া দলটি।

ক্রিকেট বোর্ডে সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও আর্থিক দূর্ণীতির ফলে জিম্বাবুয়ের সদস্য পদ স্থগিত করেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি।

দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে পারলেও আইসিসি আয়োজিত কোন ইভেন্টে জিম্বাবুয়ের অংশগ্রহণ অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত রেখেছে আইসিসি।
এর ফলে ২০২০ টি২০ বিশ্বকাপের বাচাই পর্ব খেলতে পারেনি জিম্বাবুয়ের নারী ও পুরুষ ক্রিকেট দল এরও আগে ঘরের মাঠেই (২০১৮)বিশ্বকাপ ২০১৯এ জায়গা করে নিতেও ব্যর্থ হয় দলটি।

এন্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, এলিস্টার কেম্পবল, হিথ স্ট্রিক, মারি গডউইন, নেইল জনসন, হেনরি উলঙ্গা, এন্ডি ব্লিগনট, ডেভিড হাউটন এর উত্তরসূরীরা এখন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের অস্তমিত সূর্যের শেষ অংশ দেখার প্রতিক্ষায়।

২০০২ সালের পর থেকেই অস্থিরতা বিরাজ করছিলো গোটা জিম্বাবুয়েতে। অথচ ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত স্বর্ণ যুগ ছিল দেশটির ক্রিকেটের। “জাতির পিতা” থেকে “স্বৈরশাসক” বনে যাওয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের “গণতন্ত্র” হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিপাদ ও কৃষনাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ দ্বন্দ শুধু প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট কেই হত্যা করেনি সেইসাথে দেশটির অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা কেও পুরপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

২০০৩ বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে “গণতন্ত্র” হত্যার প্রতিবাদে তৎকালীন অধিনায়ক এন্ডি ফ্লাওয়ার ও হেনরি অলঙ্গা ক্রিকেটকে বেছে নেন প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে।
১০ ফেব্রুয়ারি ০৩ নামিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে “কালো আর্ম ব্যান্ড” পরে মাঠে নামেন দুজনেই।

অভিনব এই প্রতিবাদের পর এন্ডি ফ্লাওয়ারের ক্যারিয়ার বাচলেও ঐ একটি ঘটনায় পুরো জীবন পালটে যায় হেনরি অলোঙ্গার।
গ্রেফতারী পরোয়ানার পাশাপাশি মাথায় মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই ক্রিকেট তথা দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ড পারি জমান সুপার “সিক্সে” কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ খেলেই।এর মাঝেই ৬ ম্যাচ তাকে বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ট বোর্ড তার অফ ফর্মের কারনে।
বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন ওপেরা সিঙ্গার হিসেবে।

একটা সময় বাংলাদেশ – জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট মানেই অসম লড়াই হেসেখেলেই বাংলাদেশ কে হারাতো তারা কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশের কাছে নেহাত বাচ্চা শিশু।

বাংলাদেশ আজকের এই অবস্থানে আসার পিছনে জিম্বাবুয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
২০০০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত যখন বাংলাদেশ কে ক্রিকেট বিশ্বের দুয়ো শুনতে হতো তখন সেই সময়ের সমীহ জাগানিয়া দলটিই ম্যাচের পর ম্যাচ খেলে যেতো বাংলাদেশের বিপক্ষে। মাঠে অপ্রতিরোধ্য, কঠিন হলেও মাঠের বাইরে প্রতি ম্যাচেই এন্ডি ফ্লাওয়ার,হিথ স্ট্রিকরা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পিঠ চাপরে অনুপ্রেরণার বাণী শুনাতেন।
প্রতি ম্যাচে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা বাংলাদেশের বিপক্ষে কখনো “খেলবোনা” বা তাচ্ছিল্যের সুর তোলেননি।

সেই সোনালী অতিতের পর আর কিছু প্লেয়ার তুলে এনেছিলো জিম্বাবুয়ে যারা প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট কে আগের রুপে ফিরিয়ে নিতে কিন্তু যে সুর-তাল-লয় একবার কেটে যায় সেটা যে ফিরে পেতে তাদের এখনো সংগ্রাম করতে হবে কে জানতো?

হ্যামিল্টন মাসাকাডজা গতকাল বাংলাদেশের বিপক্ষে তার শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন, আফগানিস্তান ম্যাচ দিয়েই দীর্ঘ ১৮ বছরের ক্যারিয়ারের পরিসমাপ্তি টানতে যাচ্ছেন।ইচ্ছে ছিল আগামী টি২০ বিশ্বকাপ খেলে অবসরে যাবেন কিন্তু নিষেধাজ্ঞায় পরে ও নতুনদের সুযোগ করে দিতে আগেভাগেই সরে যাচ্ছেন।

বন্ধু ব্রেন্ডন টেইলর তারও যাবার সময় হয়ে এসেছে যদিও আর ৩/৪ বছর ক্রিকেট খেলবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ক্রিস্টোফার এমপুফোর ড্যবু সেই ২০০৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডেতে।
তাকে দেখেই বাংলাদেশের টেস্টে উত্থান এর গল্প মনে পরে গেলো।
২০০৫ চট্রগ্রাম টেস্টে তার অভিষেক হয়েছিলো সেই ম্যাচটা বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় ছিল এবং শেষ জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনিই আশরাফুলের শর্ট সিলি মিডওফে ক্যাচে পরিনত হয়েছিলেন এনামুল হক জুনিয়রের বলে।

রেমন্ড প্রাইস,প্রস্পার উতসেয়া,স্টুয়ার্ট ম্যাটসিক্যানেরি,তাতেন্দা টাইবু,এলটন চিগামবুরা,ব্রেন্ডন টেলর,মাসাকাডজা,ডগলাস হুন্ডো,হুসিমুসি সিবান্দা,চামু চিবাবা,ব্রায়ান ভেটোরি বা চার্লস কভেন্ট্রি কিংবা এ যুগের সিকান্দার রাজা,কাইল জার্ভিস,গ্রোয়েইম ক্রেইমার,ম্যালকম ওয়ালার,চান্ডাই চাতারা,তানিশা পানিয়াঙ্গারা পারফরম্যান্সে যতই পিছনে পরে থাক এরপরও সবসময় প্রিয় ক্রিকেটারদের কাতারেই থেকে যাবেন আজীবন।

 

ক্যারিয়ারে টাইবু,চিগাম্বুরা,টেলর,মাসাকাডজা,রেমন্ড প্রাইস বা চালর্স কভেন্ট্রির মতো ক্রিকেটাররা বারংবার বাংলাদেশ কে মাঠের ক্রিকেটে টাফ টাইম দিয়ে গেছেন।

তামিমের সাথে রেমন্ড প্রাইসের মাঠে বাকযুদ্ধ, ব্রায়ান ভেটোরি কে “অর্ডিনারী” বলেও সিরিজে তার বিপক্ষে ৩ বার আউট হওয়া কিংবা সেই ঐতিহাসিক বুলাওয়ের ম্যাচে চার্লস কভেন্ট্রির ১৯৪ রান করে সাঈদ আনোয়ারের সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ওয়ানডে ব্যক্তিগত রানের মালিক হওয়া(তখন পর্যন্ত ২০০৯) এবং ৩১৩ রানের লক্ষে খেলতে নেমে তামিমের ক্যারিয়ার বেস্ট ১৫৪ রানে মহা কাব্যিক ইনিংসে বাংলাদেশের জয় সেইসব ঘটনাগুলো এখনো চোখে লেগে আছে।

যাদের হারাতে হারাতেই বাংলাদেশের জয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা,তথাকথিত বড় দল বা মাঝারি দল হয়ে উঠা আজ তাদের পতন দেখছি!

(আশার কথা হলো, মাসাকাডজা ও টেলরের ভাষ্যমতে “সমস্যা প্রায় অর্ধেক সমাধান হয়ে গেছে”! এখন আদৌতে কতটুকু সমাধান হয়েছে সেটা সময় বলে দেবে!)

শুভকামনা তাদের জন্যে সকল সমস্যা কাটিয়ে পুনরায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল আবার স্বরুপে ফিরবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: